পত্রদূত ডেস্ক: স ম আলাউদ্দীন একটি চেতনা, একটি স্বপ্ন। সাতক্ষীরাবাসির আশা-আকাক্সক্ষার বাতিঘর। মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও সাবেক প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য। সৃজনশীল প্রতিভার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। আধুনিক সাতক্ষীরার কৃষি, শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য-সংস্কৃতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে এই মানুষটি ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। অন্যায়-অসত্যের বিরুদ্ধে ছিল যার সংগ্রাম, সেই মানুষটি ১৯৯৬ সালের ১৯ জুন রাতে ঘাতকের গুলিতে শহিদ হন। তাই জুন মাস আসলেই শোকার্ত পরিবেশ বিরাজ করে স্বজন, সুহৃদ ও সহযোদ্ধাদের মধ্যে। দৈনিক পত্রদূতের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা স ম আলাউদ্দিন মহান মুক্তিযুদ্ধের তৎকালিন গণপরিষদের ও প্রাদেশিক পরিষদের যে ক’জন সদস্য সরাসরি অস্ত্র হাতে রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছিলেন তাদেরই অন্যতম স ম আলাউদ্দিন।
স ম আলাউদ্দীনকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেছিলেন বৃহত্তর পাইকগাছা থানার বিএলএফ (মুজিব বাহিনী) কমান্ডার শেখ শাহাদৎ হোসেন বাচ্চু। শেখ শাহাদৎ হোসেন বাচ্চুর সাক্ষাৎকারটির অনুলিখনে ছিলেন দৈনিক পত্রদূতের পাইকগাছা প্রতিনিধি প্রকাশ ঘোষ বিধান
১৯৭১ সালের মে মাসে বিএলএফ (মুজিব বাহিনী) এর সাংগঠনিক কাঠামো দাঁড় করিয়ে ছাত্রলীগের ছেলেদের বাছাই করে দার্জিলিং ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা। খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া ও বরিশাল নিয়ে এফ সেক্টর গঠিত হয়। এফ সেক্টর কমান্ডার ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। আমির হোসেন আমুর মূল দায়িত্ব ছিল বনগাঁয়ে বসে। বিভিন্ন এজেন্টের মাধ্যমে ছেলেদের বাছাই করা। আমু ভাই’র পক্ষে এমপি আলাউদ্দিন ভারতের বশিরহাটে একটি হোটেলে গোপন রিক্রটিং অফিস করেন। এমপি হিসেবে টাকি, তকিপুরসহ বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে তিনি ছেলেদের ভালমন্দ খোঁজ খবর নিতে যেতেন। আর সেই সুযোগে তিনি নেতৃস্থানীয় ছেলেদের তাদের নিজস্ব সীমান্তে গিয়ে যুদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ করতেন। এসব ছেলেরা ক্যাম্প থেকে পালিয়ে তার সাথে দেখা করলে তাদের খরচা দিয়ে বনগাঁয়ে আমু ভাই এর কাছে পাঠিয়ে দিতেন। মুজিব বাহিনীর কয়েকটি গ্রুপের ট্রেনিং শেষ হয়ে যাওয়ার পর সাতক্ষীরা মহাকুমার কিছু ছেলেদেরকে নিয়ে তিনি দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন এবং তালার নি¤œাঞ্চলে ক্যাম্প নির্মাণ করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে একাত্তরের শেষ সময়ে এসে দক্ষিণ খুলনার ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্য কেন্দ্র কপিলমুনিতে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধ একাধারে চলে ৭২ ঘন্টা। এই যুদ্ধ হয় মুক্তি ও মুজিব বাহিনীর সম্মিলিত কমান্ড ও অন্য দিকে রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর মধ্যে। অবশেষে পরাজয় ঘটে রাজাকার ও আলবদরদের। বন্দী হয় ১৫১ জন রাজাকার ও আলবদর। কপিলমুনি সহচরী বিদ্যামন্দির প্রাঙ্গণে তাদের সকলের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। ঐতিহ্যবাহী কপিলমুনির প্রতিষ্ঠাতা রায় সাহেব বিনোদবিহারী সাধুর পরিত্যক্ত বাড়ি ছিল ২৭৩ জন রাজাকার ও আলবদরদের দুর্ভেদ্য ঘাটি। ১২ ফুট উঁচু ও তিন ফুট প্রশস্থ প্রাচীর বেষ্টিত ২টি লোহার কলাপসিবল গেট দ্বারা সুরক্ষিত কপোতাক্ষ তীরে বহু কক্ষ বিশিষ্ট দ্বিতল প্রাসাদ। বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ রাজাকার বাহিনী এই বাড়িতে ক্যাম্প তৈরীর পর শুরু রসদ যোগাড়ের পালা। কপিলমুনি বাজার থেকে শতশত বস্তা চাল, ডাল, আটা, ময়দা, ঘি, তেলসহ প্রয়োজনীয় সব কিছু। লুট করে উক্ত বাড়ির একটি কক্ষে বোঝাই করতো। কাশিমনগর হাট ও এলাকা থেকে পছন্দের গরু ছাগল ধরে আনতো। ৪ জন বাবুর্চি ছিল রাজাকারদের বাদশাহী কায়দায় খানাপিনা তৈরী করা ও আপ্যায়ন করার জন্য। রাজাকারদের প্রধান কাজ ছিল এলাকা থেকে সুন্দরী যুবতী মেয়েদের ধরে আনা এবং তাদের উপর পাশবিক অত্যাচার চালানো। উক্ত ক্যাম্পে নারী নির্যাতনের জন্য দুটি আলাদা কক্ষ নির্ধারিত ছিল। একাধারে ১০-১২ জন রাজাকার একজন একজন মহিলার উপর পাশবিক অত্যাচার চালিয়েছে একই কক্ষে। অতীব সুন্দরী হিন্দু এক মেয়ের উপর ৩০ জন রাজাকার একাধারে পাশবিক নির্যাতন করলে তার মৃত্যু ঘটে। নারী নির্যাতনের পাশে একটি ছোট রুমে আওয়ামী লীগ কর্মী ও মুক্তিযোদ্ধাদেরকে ধরে এনে শারীরিক অত্যাচার করে গোপন তথ্য বের করার চেষ্টা চালাতো। তারপর রুমের দেওয়ালের সাথে হাতে পায়ে, মাথায় ও বুকে রড লোহার পেরেক বিদ্ধ করে নির্মমভাবে খুন করতো। যুদ্ধ শেষে মুক্তিযোদ্ধা রুস্তমের দেহ পেরেক বিদ্ধ অবস্থায় দেওয়ালের গায়ে পাওয়া যায়। পাশে পড়েছিল কয়েক শত জোড়া জুতা। এই সব জুতার মালিক ছিল সেই সকল হতভাগ্য গ্রামের নীরিহ যুবক যুবতির। রাজাকারের অপারেশন ডায়রি থেকে জানা যায় ১৪ শত ১৩ জন মানুষকে তারা খুন করেছিল। রাজাকারদের আগ্নেয়াস্ত্র বলতে রাইফেল ছাড়া আর কিছু ছিল না। তবে টিন দিয়ে বড় ব্যারেল তৈরী করে কামান মতো ডামি কামান ছাদের উপর পেতে রেখেছিল। বাইরে থেকে দেখে সবাই দারুণ ভয় পেতো। ছাদের উপর বালির বস্তা দিযয়ে বাঙ্কার করা ছিল। মনে হতো ছাদের উপর কামান পাতা আছে। কপিলমুনি থেকে ৯ কিলোমিটার দূরে তালা থানার মাগুরা ইউনিয়নের মাদরা গ্রামে ছিল মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প। কয়েকশত মুক্তিবাহিনী ও মুজিব বাহিনীর একটি শক্তিশালী কমান্ড এই গ্রামটি নিরাপদ জেনে ঘাটি স্থাপন করেছিল। কমান্ডার ছিলেন খুলনা মহাকুমার মুজিব বাহিনী প্রধান ইউনুস আলী ইনু ও তালা থানা মুজিব বাহিনী প্রধান মোড়ল আব্দুস সালাম। দুইজনই ভারতের দেরাদুন থেকে বিশেষ গেরিলা ট্রেনিংপ্রাপ্ত দুই কমান্ডারের একান্ত প্রচেষ্টায় দুই মাসের মধ্যে তালা থানার ১২টি ইউনিয়নে দুইশতাধিক গেরিলা যোদ্ধা তৈরী হয়। গেরিলাদের অস্ত্র সরবরাহ করেন মুক্তিযোদ্ধা ও বৃহত্তর খুলনা জেলার মুজিব বাহিনী প্রধান শেখ কামরুজ্জামান টুকু ও তৎকালীন এমপি সাতক্ষীরার অন্যতম মুক্তিযোদ্ধা মরহুম স ম আলাউদ্দিন। কপিলমুনি যুদ্ধের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন ৭১ এর ২০ নভেম্বর কমান্ডার ইউনুস আলী ও মোড়ল আব্দুস সালাম। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রধান প্রধান নেতৃবর্গ ও কমান্ডারদের সমন্বয়ে এক জরুরী বৈঠক আহবান করা হয়। মাগুরার প্রখ্যাত জমিদার শান্তি শেখর রায় চৌধুরী ওরফে ঝুনু বাবুর দোতালায় রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়। আলোচনায় কপিলমুনি যুদ্ধের চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণসহ তারিখ নির্ধারণ করা হয়। বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন শেখ কামরুজ্জামান টুকু, ক্যাপ্টেন শফিউল্লাহ, স. ম বাবর আলী, স. ম আলাউদ্দিন, সুভাষ সরকার, ইঞ্জি: মুজিবর রহমান, সামছুর রহমান, মাষ্টার সুজাত আলী, আবুল কালাম আজাদ, নির্মল পাল। বৈঠকের আহবায়ক ছিলেন ইউনুস আলী ইনু ও মোড়ল আব্দুস সালাম। রাজাকারদের সমরাস্ত্র ও জনবল সম্পর্কিত গোপন সংবাদ সরবরাহ করেন সরদার ফারুক আহমেদ ও চেয়ারম্যান নূর খাঁ। তৎকালীন পাকিস্থান নৌ বাহিনীর লে: গাজী রহমত উল্লাহ দাদুকে ৮শত মুক্তিযোদ্ধার প্রধান কমান্ডার নির্ধারণ করা হয়। তার নির্দেশে যুদ্ধ চলবে এবং শেষ হবে ব্যতিক্রম হলে রেহাই পাবেনা কোন মুক্তিযোদ্ধা দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ মুজিব ও মুক্তিবাহিনীর সম্মিলিত কমান্ডার কপিলমুনির রাজাকার বাহিনীকে সমুলে নিধন করা পর্যন্ত একজন মুক্তিযোদ্ধাকেও জীবিত ফিরে আসতে দেওয়া হবে না। ৬ ডিসেম্বর হাড় কাপানো শীতে ৮ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা ১৮টি দলে বিভক্ত হয়ে ১০ জন কমান্ডারের নেতৃত্বে বিভিন্ন পথে রাত ১২টায় মাদরা থেকে রওনা দেয় কপিলমুনিতে। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে রাইফেল, এসএলআর, মর্টার, অটোমেটিক রাইফেলসহ প্রচুর গোলাবারুদ ও আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। সিদ্ধান্ত ছিল শেষ রাতে মর্টারের গোলা নিক্ষেপের মাধ্যমে যুদ্ধ শুরু হবে। কিন্তু কমান্ডার স ম বাবর আলীর গ্রুপ সোনাতনকাটি খেয়া পার হয়ে নাসিরপুর ব্রিজের সন্নিকটে পৌছালে ১৪জন ডিউটিরত রাজাকারকে যুদ্ধ মাঠের সংকেত দ্বারা অভিহিত করা হয়। শত্রু পক্ষের লোক বিধায় সংকেতের জবাব দিতে ব্যর্থ হলে স. ম বাবর আলীর হাতে এলএমজি’র ব্রাশ ফায়ারে ১৮ জন রাজাকার ঘটনা স্থলে নিহত হয়। এই অনাকাক্সিক্ষত বিভ্রাটে মুক্তিযোদ্ধাদের বেশ অসুবিধা ও বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছিল। যদিও তাতে কোন আত্মঘাতিমূলক ঘটনা ঘটেনি। ১৯৭১ এর ৬ ডিসেম্বর শেষ রাতে মুক্তিবাহিনী সম্মিলিতভাবে সাড়াশি আক্রমণ শুরু করে রাজাকারদের মূল ঘাটিতে। ডিনামাইট দিয়ে কপিলমুনি ও তালার মধ্যবর্তী কালভাট উড়িয়ে দেওয়া হয়। রাস্তায় মাইন বসিয়ে গেরিলারা এম্বুশ পেতে রাখে। টেলিফোন লাইন বিচ্ছিন্ন করা হয়। এই স্থানে কার্ট অফ পার্টির কমান্ডার ছিলেন স. ম আলাউদ্দিন। আরসিএল এর শতশত গোলা নিক্ষেপ করেও উক্ত রাজাকার দূর্গের একটি ইটও খসানো যায়নি। বিরামহীন যুদ্ধ চলতে থাকে। এই যুদ্ধে দু’জন বীরমুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন গাজী আনসার আলী ও শেখ আনোয়ার হোসেন। রাজাকারদের কাছ থেকে রাইফেল ছাড়া অন্য অস্ত্রের ব্যবহার হয়নি বা ছিল না। একটানা দুইদিন দুইরাত যুদ্ধ চলার পর রাজাকার আত্মসমার্পন করল না এবং বাড়ির একটি ইট খসানো সম্ভব হলোনা। যুদ্ধবিরামহীন চলতে থাকে। এমতাবস্থায় বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা স ম আলাউদ্দিন ভারতে চলে যান মর্টার আনার জন্য। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরের দিন রাজাকারদের বারবার নির্ধারিত সময় দিয়ে আত্মসমার্পন করতে বলা হয়। কিন্তু উত্তরে তারা আত্মসমর্পন না করে বাড়ির ভিতর থেকে মাইকে মুক্তিযোদ্ধাদের লক্ষ্য করে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে। এমনকি রাজাকাররা মুক্তিযোদ্ধাদেরকে বিভিন্ন হুমকি প্রদর্শনসহ তাদের কাছে আত্মসমর্পন করতে বলে। এই ঘোষণা শুনে মুক্তিযোদ্ধাদের মেজাজ চরমে উঠে যায়। তারা আমরণ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে। তিনদিন তিনরাত যুদ্ধ চলার পর বাঁচার কোন পথ নেই দেখে রাজাকাররা দুর্বল হয়ে পড়ে। ক্লান্তিতে দুর্বল হয়ে ভেঙে যায় তাদের মনবল। অবশেষে নির্ধারিত সময়ের বহু পরে ৯ ডিসেম্বর বেলা আড়াইটায় মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হয়। স ম আলাউদ্দিন মর্টার নিয়ে কপিলমুনি পৌছাবার কিছুক্ষণ আগে নরপিশাচ ১৫১ জন রাজাকার ও আলবদর মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট আত্মসমর্পন করে। স ম আলাউদ্দিন বৃহত্তর খুলনা জেলার একমাত্র এমপি বা জনপ্রতিনিধি যিনি দেশের অভ্যন্তরে থেকে অস্ত্র হাতে সরাসরি শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন।
The post স্মরণ: রণাঙ্গনে সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেন স ম আলাউদ্দিন appeared first on Daily Patradoot Satkhira.
from Daily Patradoot Satkhira https://ift.tt/3pwzsbe
No comments:
Post a Comment