গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি ঝরছিল সেদিন। এমন দূর্যোগে একান্ত প্রয়োজন না পড়লে কেউ ঘরের বাইরে পা দেয় না, নদীপথে তো নয়ই। দুটি ছই ওয়ালা নৌকায় আমরা কয়েকজন প্রাণী। সারা রাত বৃষ্টির মধ্যেই নদীপথে চলেছি। দুই নৌকার মাথায় পাটাতনে বসে ছিপছিপে বৃষ্টিতে বিরামহীন বৈঠা টেনে চলেছে মাঝীরা। অন্ধকার নদীবক্ষে তেমন কিছুই দেখা যায় না। ঢুলু ঢুলু চোখে তবু হ্যারিকেনের টিমটিমে আলোয় যতটুকু চোখ যায় মাঝে মাঝে দেখার চেষ্টা। মৃদু হিমেল হাওয়ায় শান্ত নদীতে শুধু পাশাপাশি দুটি নৌকার বৈঠা ফেলার ছপ ছপ শব্দ ছাড়া আর সব জমাট বাঁধা এক নিরবতার চাদরে ঢেকে আছে যেন! একটু পর পর নাকে এসে ঝাঁপটা লাগছে তিব্বত আতোর এর ঘ্রাণ। ছোট্ট দেহ- মনের ওপরে চিরদিনের মত দাগ কেটে দিয়ে এক গভীর শীতল পরশ বুঝি বুলিয়ে যাচ্ছে! পেছনের নৌকায় সদ্যজাত বোনটিকে কোলে নিয়ে বসে নির্ঘুম রাত পার করছে রবের মা। চেষ্টা করছে নবজাতকের মুখে মাঝে মাঝে মিষ্টি পানীয় কিছু দিয়ে তাকে শান্ত রাখার। সাথে আরো দু’তিন জন।
আমাদের নৌকায় আব্বা সহ আমরা কয়েকজন। এরই একপাশে সাদা কাফনে মোড়ানো মায়ের মৃত দেহটা খানিকটা দূরে সাবধানে রাখা। কাচারি বাড়ি থেকেই গোসল সেরে, কাফন পরিয়ে, আতোর-গোলাপজলে সুরভিত করে, জানাজা শেষে তাঁকে নিয়ে আমরা বের হয়েছি। গেলো রাতে ছোটবড় ভাইবোন চারজন মিলে অনেক কান্নাকাটি হয়েছে। আজকে সবাই যেন একেবারে বোবা, কারো মুখ ফুটে কোন কথাই বের হচ্ছে না। যেন শোকের সাগরে নাও ভাসিয়ে অপেক্ষকৃত তরুণ এক বাবা তাঁর পাঁচটি শিশু সন্তানকে সাথে নিয়ে অজানা কোন গন্তব্যে চলেছে, যাদের সবচেয়ে বড় ছেলেটির বয়স সাত কি আট হবে! পত্নী বিয়োগের শোক এই পিতাকে যতটা না পেরেশান করেছে তার থেকে কঠিন শোকের সীমাহীন অথৈ সাগরে ভেসেছে বুঝি তাঁর তরী অবুঝ এই শিশুদের কথা ভেবে!
অবশেষে ভাসতে ভাসতে তরী তীরে এসে ভিড়লো। সকাল কয়টার দিকে তা মনে রাখার বয়স হয়নি। শুধু আবছা আবছা মনে পড়ে, বৃষ্টি তখন আরও একটু জেঁকে শুরু হয়েছে। আত্মীয় স্বজনরা আগের থেকেই কিভাবে যেন খবর পেয়েছে। সম্ভবত কাউকে আগে পাঠানো হয়েছিল। অনেকেই নদীর ঘাটে চলে এসেছে ততক্ষণে। ভাটির সময় চলছে, তাই পাড় থেকে নৌকা বেশ দূরেই রাখা হয়েছে। কয়েকজন মিলে নৌকা টেনে ভেড়ির কাছাকাছি নিয়ে আসে। তারপর আমাদের কয় ভাইবোনকে কোলে করে করে নৌকা থেকে নামায়। আমাদের জড়িয়ে ধরে তারা অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়ে। এরপর কিভাবে, কত পথ আমরা এসেছিলাম মনে নেই। বাড়িতে এসে দেখলাম, তিল ধারণের যায়গা নেই। কখন মায়ের দাফন হয়েছিল তাও মনে নেই, শুধু আবছা মনে পড়ে কেউ একজন আমাকে কোলে করে নিয়ে মায়ের কবরের পাশে নিয়ে আসে, এক মুঠো মাটি হাতে দিয়ে বলে, ওখানে দাও। খুব কম বয়সে মা চলে গেলেন, আমরা অপেক্ষাকৃত বড় তিন ভাইবোন আবার কয়েকদিন পর আব্বার চাকরিস্থল সাতক্ষীরার তালা থানার খলিশখালী কাচারি বাড়িতে চলে এলাম। পেছনে রেখে গেলাম ছোট্ট দু’টি বোনকে। নবজাতক বোনটিকে রাখা হয়েছিল দূর সম্পর্কের এক নিঃসন্তান নানীর কাছে। সে তিন মাস বেঁচে ছিল। পৌনে দু’বছর বয়সের বোনটা মরে যেতে যেতে নানা-নানীর অনেক চেষ্টা তদবিরে অবশেষে বেঁচে গিয়েছিলো।
সেই সত্তর সালের কথা। অত ছোট বেলার স্মৃতি, তেমন কিছু মনেও পড়েনা। তবু এটা তো এখন বুঝি, মা মানেই মা। মায়ের সাথে দুনিয়ার কোন সম্পর্ককে তুলনা করা যায় না। সন্তান মায়ের গর্ভে আসার পর থেকে যতদিন সে ভূমিষ্ঠ না হয় ততদিন তো সে মায়ের সমস্ত অস্তিত্বের সাথে মিশে থাকে। তারপর জন্মের পর থেকে চারপাশে সে শুধু তার মাকেই দেখতে পায়। তার খাওয়া-নিদ্রা-জাগরণ, প্রস্রাব-পায়খানা, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, খেলাধুলা, হাসি-কান্নার প্রত্যেকটি মুহুর্ত সে অনুভব করে মায়ের স্নেহ-আদর মাখা পরশ। এরই মাঝে বেড়ে উঠতে থাকে সে আর তার সমস্ত চাওয়া-পাওয়া, আবদার-আহ্লাদ, মান-অভিমানও একটি যায়গাতেই কেন্দ্রীভূত হতে থাকে। এভাবে কিছুদিনের মধ্যেই সে আবিস্কার করে নেয় তার একান্ত নির্ভরতার মানুষটিকে। শিশু যতই বেড়ে উঠতে থাকে ‘মা’ নামক মানুষটিকে ঘিরে তার বুকের মধ্যে আস্থা আর নির্ভরতার এক বিশাল বৃক্ষের জন্ম নেয়। সেই বৃক্ষের ছায়ায় পরম প্রশান্তিতে তার শিশুমন আস্তে আস্তে পূর্ণতার দিকে ধাবিত হয়।
হঠাৎ একদিন আকাশে কালোমেঘ পুঞ্জিভুত হয়। প্রকৃতি প্রচন্ডরকম বৈরীরূপ ধারণ করে। পৃথিবীর সাজানো বাগানে কালবৈশাখী ছোবল হানে। রুদ্ররূপী কালবৈশাখী শিশুর পরম নির্ভরতার বিশাল বটবৃক্ষটিকে একেবারে শেকড় সহ উপড়ে ফেলে দেয়। আর চরম নিষ্ঠুরের মত সেই যায়গায় সৃষ্টি করে যায় এক বিশাল গহ্বর। ছোট্ট শিশুর বুকের মধ্যে এখন বিরাট শূণ্যতা, বিশাল গহ্বর। অকস্মাৎ সে হুমড়ি খেয়ে পড়ে ঐ বিশাল গহ্বরের মধ্যে। তার মমতার বিশাল সম্পর্কটির ছেদ হয় চিরদিনের মতো!
পৃথিবী জুড়ে হাজারও মানুষ, অনেক কাছের মানুষও চারদিকে! কিন্তু ঐ বিরাট শূণ্যতা, বিশাল গহ্বর পুর্ণ করার সাধ্য যে কারো নেই! হবেও না কোনদিন!
কোহিনূর বিনতে আবুবকর।
The post অবেলায় যেন বিদায় না নিতে হয় কোনো মাকে! appeared first on Daily Patradoot Satkhira.
from Daily Patradoot Satkhira https://ift.tt/2yGv5nE
No comments:
Post a Comment