Wednesday, May 13, 2020

সবার আগে ঈমান/ কোহিনূর বিনতে আবুবকর https://ift.tt/eA8V8J

ঈমান ইসলামি জিন্দেগীর মাথা। ঈমান হলো ভিত বা বুনিয়াদ। এই বুনিয়াদ বা ভিত মজবুত ও নতুন হলে সবকিছু ঠিক থাকবে। ইসলামী জিন্দেগী যে পাঁচটি বিষয়ের সমন্বয়ে গঠিত পরিপূর্ন জীবনবিধান তার প্রথম নম্বরেই আছে ঈমানের স্থান। ঈমান ছাড়া অন্যান্য চারটি শর্ত আমরা যতই সুন্দর ও সফলতার সাথে পূর্ণ করি না কেন তার কোন মুল্যই নেই আল্লাহতাআলার কাছে। ঈমান ছাড়া আমরা মুসলমান হতেই পারব না। আর মুসলমান না হয়ে আমরা যতই এবাদত করি, যতই সুন্দর স্বভাবের হই, মানুষের সাথে আমাদের লেন-দেন, আচার-আচরণ যতই সুন্দর করি না কেন, এগুলোর কোন গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না আল্লাহ্ তা’আলার কাছে। মুসলমানদের ঈমান এমন যা তাদেরকে একাধারে আস্তিক বানায় আবার মুসলমানও বানায়। যেমন-এক আল্লাহ্ বা ¯্রষ্টায় বিশ্বাস স্থাপন করা এবং তাঁরই একক ক্ষমতা ও একচ্ছত্র অধিকারকে স্বীকার করে নিয়ে জীবনের সমস্ত কর্মকান্ড সম্পাদন করাই হলো মুসলমানদের আকিদা। কোন একজন ¯্রষ্টা বা নিরঙ্কুশ ক্ষমতাধর কাউকে আমরা যদি স্বীকারই না করি, তাঁর সন্তুষ্টির খেয়াল যদি আমাদের মাথায় নাই থাকে তাহলে আমরা কার কাছে আত্মসমর্পণ করব, কার ইবাদাত করবো, কাকে আমাদের প্রভু মেনে নিয়ে তাঁর আদেশ-নিষেধ পালন করব?
আমরা নামাজে দাঁড়িয়ে, রুকুতে গিয়ে, সেজদায় মাথা নত করে নিজেদেরকে পরিপূর্ণরূপে সমর্পণের ভঙ্গিতে কারো উদ্দেশ্যে কিছু বলি, কিছু চাই, তার অর্থ এই যে, আমরা কাউকে স্বীকার করি, মান্য করি এবং আমাদের জীবনের সবকিছু দিয়েই তাঁকে খুশি করার চেষ্টা করি। অন্তর দিয়ে এই বিশ্বাস এবং মুখ দিয়ে এর স্বীকৃতি আমাদেরকে আস্তিক বানায়। আর যখন আমরা নিজেদেরকে আস্তিক ভাবি তখন আমাদের কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য চলে আসে যা প্রতিটি মুসলমান কাজে-কর্মে প্রকাশ ও প্রতিষ্ঠিত করে দেখায় যে সে মুসলমান। এটা এমন এক জীবন বিধানের প্রতি মুসলমানদের উদ্বুদ্ধ করে যে, শুধু বিশ্বাস আর মুখে স্বীকারই নয় বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত বাস্তবায়ন করেই তাদের দেখাতে হয় যে, তারা মুসলমান। এভাবে মুসলমানদের ঈমান তাদেরকে প্রথমে আস্তিক হতে শেখায়। তারপর এই আস্তিকতাই তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করে কাজে-কর্মে, প্রত্যেকটি বিষয়ে সেই নিরঙ্কুশ ও একমাত্র ক্ষমতাধরের প্রতি পরিপুর্ণ আত্মসমর্পণে।
অতএব ঈমানের প্রথম অংশ হলো-কোন শরীকদারের ন্যুনতম শরীকানাকে অস্বীকার করে আল্লাহ সুবহানআল্লাহ তায়ালার একক স্বত্তা, একমাত্র ক্ষমতা ও একচ্ছত্র অধিকারকে মনে প্রাণে স্বীকার করে নেওয়া এবং দ্বিতীয় অংশ হলো-হযরত মুহাম্মদ (স.) কে রাসুল ও শেষ নবী মেনে নিয়ে তাঁর আনীত দ্বীনের ওপরে বিশ্বাস স্থাপন করা এবং প্রিয় নবী (স.) এর তরীকা বা সুন্নাহ অনুযায়ি জীবনকে সাজানো, জীবনের সব কাজ করা। এটা প্রতিনিয়ত প্রাকটিস এর বিষয়, জীবনে বাস্তবায়ন করে দেখানোর বিষয়।
ঈমানের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা:
যে সব কারণে ঈমানের গুরুত্ব ও প্রয়োজন তা হল-ঈমান মজবুত ও তাজা হলেই আমাদের ইসলামী জিন্দেগীর অন্য যে চারটি শর্ত তা সুন্দর হবে। যেমন: ঈমানের পরে ইবাদত, তারপরে আছে আখলাক বা সুন্দর চারিত্রিক বৈশিষ্ঠ্য, এরপর মানুষের সাথে লেনদেন,কাজ কারবার, হিসাব নিকাশ সম্পর্কিত বিষয়গুলো এবং সর্বশেষ মানুষের পারস্পারিক অধিকার আদায়ের বিষয়। ঈমানের সাথে এই চারটি শর্ত অবশ্যম্ভাবীরূপে সম্পর্কিত। কারণ যার ঈমান আছে তার মধ্যে এই চারটি জিনিস থাকতেই হবে। আবার যার মধ্যে এই চারটি গুণ পরিপূর্ণ মাত্রায় আছে অথচ ঈমান নেই তার ওইসব সদগুনাবলীর কোন মূল্যই নেই। যার ঈমান আছে তার জীবন ও জীবনের সমস্ত কর্মকান্ডের মূল্য আছে। যার ঈমান যত সুন্দর তার জীবন ও জীবনের যাবতীয় কর্মকান্ডও তত সুন্দর, শান্তিময় ও বরকতময়। সুতরাং ঈমানই বুনিয়াদ, ঈমানই সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু। ঈমান কে কেন্দ্র করেই মুমিনের জীবন ও জীবনের প্রত্যেকটি কাজ-কর্ম, আচার-আচরণ, আবর্তিত হয়।
সহি মুসলিমের এক হাদীসে এসেছে, ‘প্রত্যেকটি মানব শিশুই এই পৃথিবীতে মুসলমান হয়ে জন্ম নেয়, কিন্তু যারা অমুসলিম হয়ে যায়, বেশির ভাগই তাদের বাবা মা এবং আশেপাশের পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে’।
তাই অমুসলিমের ঘরে জন্ম নিলে ঈমানহারা হয়ে অমুসলমান হওয়ার সম্ভাবনা তো থেকেই যায়। এমন কি মুসলমানের ঘরে জন্ম নিলেই আমরা সবাই পূর্ণ মুমিন বা ভালো ঈমানদার মুসলমান হতে পারবো তাও নয়। বরং মুসলমানদের এই ঈমানকে তৈরী করে নিতে হয়, মেহনত করে করে ছোটোবেলা কথা শেখার সময় থেকেই। কেমন ঈমান তৈরি করবো?
এক পাত্র দুধ থেকে যখন আমরা মাখন বের করে নিতে চাই তখন তা কিন্তু এমনিতেই হয়ে যায় না। ঐ দুধের ওপরে পরিশ্রম করেই তবে আমরা হয়তো এক শ’ গ্রাম মাখন পাই। এই এক শ’ গ্রাম মাখন হয়তো খুব সামান্য মনে হতে পারে দুধের তুলনায় কিন্তু এর ক্ষমতা এমন যে, এই মাখনটুকু যদি আমরা পানিতে ফেলে দেই তাহলে দেখব, তা পানির ওপরেই ভেসে থাকছে। একে কিছুতেই পানির সাথে মিশিয়ে বা গুলিয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ কি? কারণ হলো, এই মাখন নিজস্ব স্বকীয়তা অর্জন করেছে। এর মধ্যে এক ধরণের শক্তি তৈরি হয়েছে, যা পানির ওপরে ভেসে থাকতে তাকে সাহায্য করছে। অর্থাৎ পানির কাছে সে আর পরাভব মানছে না। পানির মধ্যে মিশে গিয়ে সে নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলছে না। কিন্তু আমরা যদি ঐ একপাত্র দুধকে পানিতে ঢেলে দিতাম তাহলে ঐ দুধ কিন্তু তার শক্তি দিয়ে পানি থেকে নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে পারতো না। দুধ পানিতে মিশে বিলিন হয়ে যেতো, নিজের অস্তিত্ব হারাতো। তাই এমনভাবে আমরা আমাদের ঈমানকে তৈরি করব যাতে কোন পরিবেশ, পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে আমাদের ঈমান এতটুকু নড়চড় না হয়। আমাদের নবী-রাসুলগণ এমন কঠিন ঈমানের বুনিয়াদ, ঈমানী চেতনার জলন্ত উদাহরণ রেখে গেছেন যে, তার থেকে বিচ্যুত হলে আমারা দ্বীনহীন হয়ে যাবো, ফলশ্রুতিতে আল্লাহ্র দ্বীন দুনিয়া থেকে বিলিন হয়ে যাবে। তাই আমরা ঈব্রাহিম (আ.) এর মতো ঈমান বানাবো, যে ঈমান আগুনে পূড়ে না, ইসমাইল (আ.) এর মতো ঈমান বানাবো যে ঈমান ছুরিধারে কাটে না, মুসা (আ.) এর মতো ঈমান বানাবো যে ঈমান পানিতে ডোবে না, ইউনুস (আ.) এর মতো ঈমান বানাবো যে ঈমান হজম করে নি:শ্বেষ করা যায় না।
তাই ঈমানকে তাজা করি বার বার:
প্রথমেই এই মাসে আমরা যে কাজটা বেশি করে করবো তা হল- আমাদের ঈমানকে বার বার নবায়ন করতে থাকব, তাজা করতে থাকবো। এই মেহনতের ফলে আমরা যে নতুন ঈমান লাভ করবো সেই ঈমানই আমাদের অন্তরকে এই মাস সহ অন্য এগারো মাসে সঠিক, সত্য, ন্যায় ও ভালো কাজের দিকে আগ্রহী করে তুলবে। ঈমান যখন মজবুত হয়ে যায় তখন নেক আমলের আগ্রহও সাথে সাথে বৃদ্ধি পায়। তাই পবিত্র এই মাসে আমরা আমাদের ঈমানকে আগে তাজা করি, নবায়ন করি।
কিভাবে করবো? সাহাবীরা যখন জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহর রাসুল তখন বললেন- বেশি বেশি করে কালিমা পড়, আর অন্যদেরকেও দাওয়াত দাও। সাহাবী-সাহাবীয়ারা যখন একজন অন্যজনের সাথে দেখা হত তখন আগে ঈমানের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেন এবং একজন অন্যজনকে কালিমা পড়ে শোনাতেন। এভাবে তারা সব সময় ঈমানের ওপর মেহনত করতেন কারণ তারা জানতেন ঈমানই হল বুনিয়াদ। এই বুনিয়াদি মেহনতকে যদি আমরা এই মাসের সুযোগ হিসেবে নিতে পারি তাহলে কতই না লাভবান হব আমরা সবাই।
ঈমান হলো অন্তরে বিশ্বাস স্থাপন করা, মুখ দিয়ে স্বীকার করা এবং প্রত্যেকটা কাজে-কর্মে অন্তরের ঐ বিশ্বাস এবং মুখের স্বীকৃতিকে প্রকাশ করার নাম। একই সাথে এই তিনটি শর্ত যতক্ষণ না পূর্ণ হবে বা এদের সংমিশ্রণ ঘটবে ততক্ষণ ঈমানের ধারণা বাস্তব রূপলাভ করবে না। কালিমা পড়া ছাড়াও অন্যান্য যে সব মাধ্যমে আমরা ঈমানকে নতুন করতে পারি বা তা নি¤œরূপ-
১. মুখ দিয়ে বেশি বেশি আল্লাহ্ সুবহানআল্লাহ তায়ালার কুদরত, শ্রেষ্ঠত্ব, বড়ত্ব ও মাহাত্ব নিয়ে আলোচনা করা। আল্লাহতায়ালার সৃষ্টি এবং আমাদের প্রতি তাঁর অপরিসীম নেয়ামতের বিষয়গুলো নিয়ে বেশি বেশি আলোচনা করা। কাউকে বলার সুযোগ না হলে নিজেই নিজেকে বলতে থাকা এবং নিজেই নিজেকে দাওয়াত দিতে থাকা।
২. এইসব কথাগুলো মুখে মুখে যেমন বলব কান দিয়েও তেমনি শুনব। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানআল্লাহ তাআলা এবং তাঁর সৃষ্টি সম্পর্কে যত আলোচনা তা কান দিয়ে শোনাও ঈমান বৃদ্ধি বা নবায়নের কারণ হতে পারে।
৩. চোখ দিয়ে বেশি বেশি করে আল্লাহ্ সুবহানআল্লাহ তাআলার সৃষ্টিরাজি দেখা। এইজন্য পবিত্র কোরআনে পৃথিবী ভ্রমণের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে এবং ভ্রমণকে ইবাদাতের পর্যায়ে রাখা হয়েছে। তাই নিয়ত করে যদি আমরা আল্লাহর সৃষ্টি দেখার উদ্দেশ্যে বাইরে বের হই এবং বেশি করে সৃষ্টির সৌন্দর্য চোখ দিয়ে দেখি তাহলেও আমাদের অশেষ নেকী হাসিল হবে এবং আমাদের ঈমান ও বৃদ্ধি পাবে ও নতুন হবে।
৪. দিল-দেমাগ বা অন্ত:করণ দিয়ে আল্লাহ্ সুবহানআল্লাহ তাআলার সৃষ্টি এবং নেয়ামত সম্পর্কে চিন্তা-ফিকির করা, ভাবতে থাকা। মুলত এই চারটি কাজ এবং পাশাপাশি কালেমা তাইয়্যেবা বেশি বেশি করে পড়ার অভ্যাস করলে ইনশাআল্লাহ আমাদের ঈমান নিত্য নিত্য নতুন হবে।
এছাড়া প্রত্যেককেই আমাদের চারিত্রিক ও মানবিক গুণাবলীর চর্চা বেশি বেশি করে করতে হবে। মানুষের সাথে লেনদেন, কথাকাজ, আচার আচরণ সুন্দর করতে হবে। আর দৈনন্দিন জীবনে যে সব মানুষর সাথে আমাদের মিশতে হয় বা যারা আমাদের রক্তের সম্পর্কের বা কাছের ও দুরের আত্বীয়-স্বজন তাদের অধিকার বা হক সঠিকভাবে আদায় করতে পারছি কি না তা হিসাব করে দেখতে হবে। এভাবে আমরা প্রত্যেকে যদি প্রত্যেকের হিসাব নিয়ে চলি তাহলে পৃথিবীতে মানুষের দ্বারা মানুষের অধিকার বা হক নষ্ট হবে না, মানুষের মাঝে ক্ষোভ-অভিযোগও থাকবে না। সবাই মিলে পৃথিবীতে আমরা শান্তির আবাসন তৈরি করতে পারব। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সেই লক্ষ নিয়ে আমরা যদি সামনে এগিয়ে যাই তাহলে আমাদের রোজা সুন্দর ও সার্থক হবে আর এই মোবারক মাসের হকও আদায় হবে। আমিন। লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক

The post সবার আগে ঈমান/ কোহিনূর বিনতে আবুবকর appeared first on Daily Patradoot Satkhira.



from Daily Patradoot Satkhira https://ift.tt/3dHsBVe

No comments:

Post a Comment