আরিফ মাহমুদ:
তাসিন মাহমুদ, চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। গেলো বছর ঘূর্ণিঝড় ‘আম্ফান’ সময় তাঁর জীবনে প্রথম স্বচক্ষে ‘হারিকেন’ দেখলো, স্পর্ষ করলো। ‘আম্ফান’ এর তান্ডবে সাতক্ষীরাঞ্চল যখন লন্ডভন্ড, গাছগাছালি, বৈদ্যুতিক খুঁটি, তার ও অন্যান্য স্থাপনা ভেঙ্গে গেছে তখন স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যুত সরবরাহ স্থানভেদে কয়েকদিন বন্ধ ছিলো। সঙ্গত কারণে সেই কয়দিন মোমবাতির পাশাপাশি ‘হারিকেন’ দেখা গিয়েছিলো কিছু কিছু বাড়িতে।
তবে ওই কয়দিনই। বাড়ির গৃহস্থলিরা অনেক বছর পর ফেলে রাখা জিনিষপত্র থেকে পুরোনো জরাজীর্ণ হারিকেন খুঁজে বের করে সাময়িকের জন্য চালুর ব্যবস্থা করেছিলো। ঘটনাটি বাস্তব।
‘হারিকেন’ পরিচিতি একটি শব্দ, নাম। তবে এখন সেটার বাস্তবিক প্রয়োগ নেই কিংবা চোখেও দেখা মেলে না। বছর কয়েক, বড় জোর এক-দেড় যুগ আগেও রাতের অন্ধকার দূর করতে গ্রামবাংলার এমনকি মফস্বল এলাকাতেও অপরিহার্য ভরসা ছিল হারিকেন ও কুপি বাতি (টেমি)। আধুনিকতার ছোয়া আর কালের বিবর্তনে সেই হারিকেনের ঠিকানা হয়েছে জাদুঘরে।
বর্তমান প্রজন্ম কিংবা শিশু থেকে কিশোর-যুবকদের অনেকেই স্বচক্ষে দেখেনি ‘হারিকেন’ ও ‘টেমি’। দৃশ্যটি সাতক্ষীরা অঞ্চলে।
আগে সাতক্ষীরার গ্রামাঞ্চলে একমাত্র আলোর উৎস ছিল হারিকেন। যাকে রাতের বন্ধু ডাকা হত। অনেকেই পড়ালেখা করেছেন হারিকেনের মৃদু আলোয়। গৃহস্থালী এবং ব্যবসার কাজেও হারিকেনের ব্যাপক চাহিদা ছিল। হারিকেন জ্বালিয়েই বাড়ি উঠানে বা বারান্দায় পড়াশোনা করতো শিক্ষার্থীরা। রাতের বেলায় পথ চলার জন্য ব্যবহৃত ছিল হারিকেন।
হারিকেন হচ্ছে জ্বালানি তেলের মাধ্যমে বদ্ধ কাঁচের পাত্রে আলো জ্বালাবার ব্যবস্থা। হারিকেনের বাহিরের অংশে অর্ধবৃক্তার কাঁচের অংশ থাকে, তেল শুষে অগ্নি সংযোগের মাধ্যমে আলো জ্বালাবার জন্য কাপড়ের শলাকা থাকে এবং সম্পৃণ হারিকেন বহন করার জন্য এর বহিরাংশে থাকে একটি লোহার ধরনি। হারিকেনের আলো কমানোর বা বাড়ানোর জন্য বহিরাংশে থাকে একটি চাকটি যা কমালে বা বাড়লে শলাকা ওঠা নামার থাকে যা দ্বারা আলো কমা বা বাড়ানো যায়।
জানা গেছে, মোঘল আমলে হারিকেনের প্রচলন শুরু হয়। রাতের আধারে বিকল্প আলোর উৎস হিসাবে ধীরে ধীরে গ্রামবাংলায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে হারিকেন। তবে এখন সেই হারিকেনের ঠাঁই হচ্ছে জাদুঘরে। হারিকেনের স্থান দখল করেছে নানা ধরনের বৈদ্যুতিক বাতি। বৈদ্যুতিক ও চায়নাবাতির কারণে শহরে হারিকেনের ব্যবহার অনেক আগেই বন্ধ হয়েছে। চার্জার লাইট, সৌর বিদ্যুত সহ বেশ কিছু আলোর যোগান থাকায় এখন আর কেউই ঝুঁকছেন না হারিকেনের দিকে। ফলে সেই আলোর প্রদীপ এখন গ্রাম থেকেও বিলুপ্ত হচ্ছে। হারিকেনের জ্বালানি আনার জন্য প্রতি বাড়িতেই
থাকতো কাচের বিশেষ ধরনের বোতল। সেই বোতলে রশি লাগিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হতো। হাটের দিনে সেই রশিতে ঝুলানো বোতল হাতে নিয়ে যেতে হতো হাটে। এ দৃশ্য বেশি দিনের নয়। পল্লী বিদ্যুতায়নের যুগে এখন আর এমন দৃশ্য চোখে পড়ে না।
প্রাচীন বাংলার গ্রামীণ ঐতিহ্য কুপি বাতি (টেমি) ও হারিকেন এখন শুধুই স্মৃতি। প্রবীণদের মতামত এক সময় হারিকেন দেখতে যেতে হবে জাদুঘরে। নতুন প্রজন্ম হয়তো জানবেও না হারিকেন কী ও হারিকেনের ইতিহাস।
The post সাতক্ষীরায় একসময়ের অপরিহার্য ‘হারিকেন’ এখন চোখেই পড়ে না appeared first on Daily Patradoot Satkhira.
from Daily Patradoot Satkhira https://ift.tt/3h9YryA
No comments:
Post a Comment