মাওলানা মুহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ
(৩য় পর্ব)
কাবাঘর সংস্কার কাজে অংশগ্রহণ ও হাজরে আসওয়াদ স্থাপনে মুহাম্মদ (সা.) ভূমিকা: মানবতার বন্ধু হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর নবুওয়াত পূর্ব জীবনের এক যুগান্তকারী ঘটনা ঘটেছিল কুরাইশ বংশের কাবা ঘর সংস্করণের সময়।যখন মহানবী (সা.) এর বয়স ছিল ৩৫ বছর। কুরাইশ বংশের গোত্রগুলো যখন ‘কালো পাথর স্থাপন’ কেন্দ্রকে নিয়ে একে অন্যের উপর ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হচ্ছিল ঠিক এসময় রাসুল (সা.) তাদের মধ্যেকর বিবাদের মীমাংসা করে দিয়ে এক পরম প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছিলেন। তারিখের সকল গ্রন্থে এঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এসেছে। আর ঘটনা মুহাম্মদ (সা.) এর ব্যক্তিত্বকে সমগ্র কুরাইশ বংশের উপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল। ইংরেজী ৬০৫ সালের দিকে কাবাঘর সংস্কারকাজ চলছে; কুরাইশ বংশের প্রত্যেক কাবিলা এই কাজে খুব আত্ম-মর্যাদা উপলব্ধি করে অংশ গ্রহণ করলো। কারণ জাহেলী যুগের মানুষরাও এই ঘরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতো এবং তারা তাদের সকল বিপদ-মুসিবত দূর করার জন্য কাবাঘরে এসে মানত করতো। যাইহোক কাবাঘর সংস্কার কাজ করতে করতে যখন হাজরে আসওয়াদ স্থাপনের সময় আসলো তখন তারা ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হলো। প্রত্যেক গোত্রের জন্য কালো পাথর স্থাপনের বিষয়টি ছিল মহাসম্মানের বিষয় তাই তারা এ কাজের প্রতি ব্যাপক আকৃষ্ট ছিল।
এমনকি তারা পাথর স্থাপনের জন্য সুদৃঢ় সংকল্প নিয়ে চার রাত কাবা চত্বরে অবস্থান করলো। অবশেষে বয়োজ্যোষ্ঠ্য কুরাইশ গোত্রপতি উমাইয়া ইবনে মুগীরা তাদের সকলকে একটি সিদ্ধান্ত দিলেন যে, তোমাদের মধ্যে মতবিরোধকে নিরষনের জন্য আমার সিদ্ধান্ত হলো আগামি কাল যে প্রথম মসজিদের দরজায় প্রবেশ করবে সেই এই পাথর স্থাপন করবে। কুরাইশ বংশের সকল ক¦বিলা এই সিদ্ধান্ত মেনে নিল। সকল গোত্র চাইলো যে আগামিকাল সকলের আগে গিয়ে আমরা উপস্থিত হবো কিন্তু আল্লাহ যা চাইলেন তাই হলো। আর ঐ রাতে এমন ঘুম সকলকে পেয়ে বসলো যে সকল গোত্রের কারোর পক্ষে কাবাঘরে পৌছানো সম্ভব হলো না। আল্লাহ তায়ালা চাইলেন যে, তিনি তার হাবিবকে নবুওয়াতের পূর্বেই মহাসম্মানিত করবেন একারণে ঐ রাতে ভোর সকালে সকলে একযোগে গিয়ে কাবার দরজার কিনারে দেখতে পেলেন সাইয়েদুল বাশার, খাতামুন নাবিয়ীন মুহাম্মদ (সা.) কে। তারা মুহাম্মদ (সা.) কে দেখেই বললো: এ যে আমাদের আলামিন, আমরা তাকে পেয়ে সন্তুষ্ট। মহানবী (সা.) তাদের একটা কাপড় আনতে বললেন। তারা কাপড় এনে মহানবী (সা.) কে দিলেন। অত:পর মহানবী (সা.) সেই পাথর খন্ডটি কাপড়ের উপরে রাখলেন। তারপর মহানবী (সা.) বললেন: প্রত্যেক গোত্রের গোত্রপতিকে কাপড়ের চতুর্দিক ধরতে বললেন।অতঃপর সকলকে সেটি উঁচু করতে বললেন। তারা সকলে সেটি একযোগে উঁচু করে মহানবী (সা.) এর নেতৃত্বে পাথরটি ভিত্তি মুলে নিয়ে গেলেন। অবশেষে পাথরটিকে মহানবী (সা.) তার নিজ হাত দিয়ে স্থাপন করলেন। হাজরে আসওয়াদ স্থাপনের মধ্যে দিয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা মহানবী (সা.) কে এক পরম মর্যদার আসনে বসালেন। সুত্র: সিরাত ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা-১/২০৩। মহানবী (সা.) এর নবুওয়াত পূর্বে জীবনে যে কুরাইশ বংশের লোকেরা তাকে আলামিন তথা চির বিশ্বস্ত বলে ডাকতো সেই তারাই মহানবী (সা.) যখন ইংরেজী ৬১০ সালে নবুওয়াত পেলেন তথা তার উপর কুরআন নাজিল হওয়া শুরু হলো তখন তারা মহানবী (সা.) কে যাদুকর বলে অভিবাদন করলো। যা আল কুরআনের সুরাহ ছফফের মধ্যে বর্ণিত হয়েছে ঠিক এভাবে-‘অত:পর যখন (মুহাম্মদ সা.) তাদের কাছে কুরআনের সুস্পষ্ট বিধানাবলী নিয়ে আগমন করলেন তখন তারা বললো, এ হচ্ছে এক সুস্পষ্ট যাদু’। সুত্র: প্রাগুক্ত, আয়াত নং-০৬।
মক্কায় মুহাম্মদ (সা.) ও কুরাইশ কাফেরদের মধ্যে দ্বন্দ সংঘাত: হযরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কায় তাঁর নবুওয়াতী জীবনের সুচনালগ্নে কাফেরদের সাথে আদর্শিক দ্বন্দ্ব পতিত হলো কারণ তারা ছিল মূর্তি পূজারী ও শিরকের পৃষ্ঠপোষক যা ছিল তাওহীদের বিপরীত।অপরদিকে মহানবী (সা.) দাওয়াত দিচ্ছিলেন খাঁটি তাওহীদের যা কুরাইশদের সুদীর্ঘকালের অনুভূতির উপর কুঠারাঘাত করেছিল যার ফলে তারা মুহাম্মদ (সা.) নানাভাবে কষ্ট দিতো। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তার বাণীকে প্রচার করার জন্য এবং স্বীয় পরিচয়কে বিশ্ববাসির কাছে জয়গান করার জন্য হযরত মুহাম্মদ (সা.) কে শেষ বার্তাবাহক হিসেবে প্রেরণ করেছেন বিশ্ববাসির কাছে। আল্লাহ দেওয়া এই হেদায়াতের আলো কেবলমাত্র তারাই পেয়েছিল যারা কেবলমাত্র তাঁকে নবী হিসাবে মেনে নিয়েছিল।আর যারা মুহাম্মদ (সা.) এর আদর্শকে অস্বীকার করেছিল তারা পথভ্রষ্টতার সুদূরে পতিত হয়েছিল। রাসুলের উপর যখন ওহী নাজিল হওয়া শুরু হলো তখন মক্কার কাফেররা আশ্চর্যান্বিত হলো।যেমন কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-‘তোমরা কি এতে আশ্চর্যান্বিত হচ্ছো, তোমাদের কাছে তোমাদের মতোই একজন মানুষের ওপর তোমাদের মালিকের বাণী এসেছে, যাতে করে সে তোমাদের (আযাব সম্পর্কে) সতর্ক করে দিতে পারে এবং তোমরা সময় থাকতে সাবধান হবে।
এবং আশা করা যায় এতে তোমাদের ওপর দয়া করা হবে।’ সুত্র: সুরাহ আরাফ, আয়াত নং-৬৩। মুহাম্মদ (সা.) এর পূর্বে আল্লাহ তায়ালা যে সকল নবী-রাসুল কে প্রেরণ করেছে এবং তাদেরকে যারা অস্বীকার করেছিল তাদেরকে আল্লাহ তায়ালা ধ্বংস করেছেন। যেমন আল কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-‘যারা শোয়ায়বকে অমান্য করলো, তারা (এমনভাবে) ধ্বংস হয়ে গেল (দেখে মনে হয়েছে), এখানে কেউ কোনোদিন বসবাসই করেনি,(বস্তুত) তারাই সেদিন ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে যারা সেদিন শোয়ায়বকে অস্বীকার করেছে। *তারপর শোয়ায়ব তাদের কাছ থেকে চলে গেল, (যাবার সময়) সে বললো হে আমার জাতি, আমি তোমাদের কাছে আমার মালিকের বাণী সমূহ পৌছিয়ে দিয়েছিলাম। এবং আমি আন্তরিকভাবেই তোমাদের কল্যাণ কামনা করেছিলাম।আর আমি কোনো আজ এসব মানুষের জন্য আফসোস করবো যারা আমার মালিককে অস্বীকার করে।’ সুত্র:সুরাহ আরাফ, আয়াত নং: ৯২-৯৩। এখানে আল্লাহ তায়ালা শোয়ায়ব (আ.) এর দৃষ্টান্ত দিয়ে একথা বুঝাচ্ছেন যে, শোয়ায়বকে অস্বীকার করার কারণে তারা যেমন ধ্বংস ও ক্ষতি গ্রস্থ হয়েছে। তদ্রুপভাবে মুহাম্মদ (সা.) কে যারা জীবনের সকল ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করবে তাদের পরিণতিও শোয়ায়ব (আ.) এর উম্মতের মতো হবে। রাসুলকে যারা রিসালাতের সর্বশেষ বার্তাবাহক হিসেবে মানবে না তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু-জানোয়ারের চেয়ে নিকৃষ্ট বলা হয়েছে এবং আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে যে চোখ, কান ও অন্তর দান করেছেন তারা সেগুলোর যথা উপযুক্ত কাজে প্রয়োগ করে না। যেমন আল কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-‘বস্তুত বহু সংখ্যক মানুষ ও জ্বিন (আছে, যাদের) আমি জাহান্নামের জন্যই পয়দা করেছি, তাদের কাছে যদিও বুঝার অন্তর আছে তবুও তারা তা দিয়ে চিন্তা করেনা।
তাদের কাছে দেখার মতো চোখ থাকলেও তারা তা দিয়ে সত্য দেখে না।আবার তাদের কাছে শুনার মতো কান আছে, কিন্তু তারা সে কান দিয়ে সত্য কথা শোনে না।আসলে এরা হচ্ছে চতুষ্পদ জন্তু জানোয়ারের মতো, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে এরা তাদের চাইতেও বেশি পথভ্রষ্ট; এসব লোকেরা মারত্মক উদাসীন। সুত্র: প্রগুক্ত, আয়াত নং-১৭৯। আর এই শ্রেণির পথভ্রষ্ট কাফের সম্প্রদায় মুহাম্মদ (সা.) কে বন্দী, হত্যা, নির্বাসিত করার ষড়যন্ত্র লিপ্ত হয়েছিল, কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাঁর হাবিবকেকে কৌশলে উদ্ধার করেছিলেন। যেমন আল কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-‘(স্মরণ করো) যখন কাফেররা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিল, তারা তোমাকে বন্দী করবে অথবা তোমাকে হত্যা করবে কিংবা তোমাকে আপন ভূমি থেকে নির্বাসিত করে দেবে; (এসময় একদিকে)তারা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিলো, (আরেক দিকে)আল্লাহ তায়ালাও (তোমাকে উদ্ধারের) কৌশল চালিয়ে যাচ্ছিলেন; আর আল্লাহ তায়ালাই হচ্ছেন সর্বোৎকৃষ্ট কৌশলী।’ সুত্র: সুরাহ আনফাল, আয়াত নং-৩০। মক্কার কুরাইশ কাফেররা মহানবী (সা.) কে হত্যার করার ষড়যন্ত্র করেছিল তা না হলে তাকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা অঙ্কন করেছিল। কিন্তু সুকৌশলী আল্লাহ তায়ালা কাফেরদের সকল ষড়যন্ত্রকে জমিনে দাফন করেদিয়েছিল এবং অবশেষে কাফেরদের ওপর ইসলাম ও মুহাম্মদ (সা.) কে বিজয় দান করেছিলেন। অন্যদিকে কুরাইশ কাফেররা বলে বসল যে, মুহাম্মদ (সা.) এর উপর কেন ধন ভান্ডার ও ফেরেশতা নাজিল হয়নি?। যেমন আল কুরআনের সুরাহ হুদের মধ্যে ইরশাদ হয়েছে-‘(হে নবী ,কাফেররা মনে করে) সম্ভবত তোমর কাছে যা ওহী নাজিল হয় তার কিয়দংশ তুমি ছেড়ে দাও এবং একারণে তোমার মনোকষ্ট হবে যখন তারা বলে বসবে, এ ব্যক্তির উপর কোনো ধন ভান্ডার অবতীর্ণ হলো না কেন? কিংবা তার সাথে নবুওয়াতের সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য কোনো ফেরেশতা এলো না কেন? আসলে তুমি তো হচ্ছো আযাবের ভয় প্রদর্শনকারী একজন রাসুল মাত্র;যাবতীয় কাজ কর্মের কর্মবিধায়ক তো হচ্ছেন স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা।’
সুত্র: প্রগুক্ত, আয়াত নং-১২। কুরাইশ কাফেররা যেমন রাসুল (সা.) এর সাথে ঠাট্টা বিদ্রুপ করেছে একইভাবে পূর্বের সকল আম্বিয়ায়ে কেরামের সাথে কাফেররা একই আচরণ করেছে। যেমন আল কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-‘তোমাদের আগেও পূর্ববর্তী জাতির কাছে আমি রাসুল পাঠিয়েছিলাম।*তাদের কাছে এমন একজন রাসুলও আসেনি ,যার সাথে তারা ঠাট্টা বিদ্রুপ করেনি।’ সুরাহ হিজর, আয়াত নং:১০-১১। সুতরাং বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কে কষ্ট দেওয়া ও তাঁর আদর্শকে বিরোধিতা করা এটি নতুন কোনো বিষয় নয় বরং পূর্ব থেকে চলে আসছে। যেমনিভাবে নবুওয়াত পরবর্তী সময়ে কুরাইশ কাফেররা মুহাম্মদ (সা.) এর সাথে নির্মম-নিষ্ঠুর আচরণ করেছিল (চলবে…)। লেখক: ইসলামী গবেষক
The post কুরআন-সুন্নায় মুহাম্মদ (সা.) এর জীবনদর্শন appeared first on Daily Patradoot Satkhira.
from Daily Patradoot Satkhira https://ift.tt/351E3JE
No comments:
Post a Comment